নড়াইল জেলার ইতিহাস ঐতিহ্য

নড়াইল জেলার ইতিহাস ঐতিহ্য
History-Traditions of Narail District

বর্তমানে নড়াইল একটি জেলা শহর। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ মাসে তৎকালীন মহকুমা হতে জেলা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এই জেলার উত্তরে মাগুরা জেলার শালিখা ও মহম্মদপুর থানা, দক্ষিণে খুলনা জেলার তেরখাদা, দীঘলিয়া ও মোল্লার হাট, পূর্বে ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ এবং পশ্চিমে যশোর জেলার অভয়নগর, বাঘারপাড়া ও কোতয়ালী থানা অবস্থিত। নড়াইল জেলার আয়তন ৯৭৬ বর্গ কিলোমিটার এবং লোকসংখ্যা ৬৫৯৬৮১ এর মধ্যে ৩৩৩৮১৬ জন পুরুষ ও ৩২৫৮৬৫ জন মহিলা। নড়াইলকে মোটামুটি নদী সমৃদ্ধ অঞ্চল বলা যায়। এই জেলার উপর দিয়ে মধুমতি, চিত্রা, কাজলা, নলিয়া, নড়াগাতি, নবগঙ্গা, কালিগঙ্গা ও আঠারবাঁকি ছাড়াও শিরোমনি শাখার গাল ও হ্যালিক্যাকস ক্যানেল প্রবাহিত ছিল। তন্মধ্যে ৩/৪ টি নদী মৃত বলা চলে, অপর ৮/৭টি নদী এখন প্রবাহমান।ভূতাত্বিকদের মতানুসারে আনুমানিক দশ লক্ষ বৎসর পূর্বে গঙ্গা নদীর পলিমাটি দ্বারা যে গঙ্গেয় ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছিলো’ সেই দ্বীপসমূহের অন্তর্গত এক ভূখন্ডই হল বর্তমান নড়াইল জেলা। তৎকালে নড়াইল জেলা সাগর তীরবর্তী বর্তমান সুন্দরবনের অন্তর্ভূক্ত ছিল। ষাট, সত্তর বৎসর পূর্বেও এই জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে পুকুর বা কুয়া খনন করে হরিণ, বাঘ ও অন্যান্য জীবজন্তুর ফসিল পাওয়া যেত এবং তা থেকে প্রমাণিত যে নদীমাতৃক এই জেলার সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনভূমি বিস্তৃত ছিলো।

ইতিহাস অনুযায়ী জানা যায় যে গুপ্ত যুগে নড়াইল অঞ্চলের পূর্ব সীমান্ত মধুমতি নদী পর্যন্ত, সমগ্র যশোর সহ গুপ্ত সম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল এবং ইহা ৩৪০ হতে ৩৭৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিলো। রাজা শাশাঙ্ক ৬০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা শাসন করেন এবং তার রাজধানী ছিল কর্ণ সুবর্ণ নগর মতান্তরে লক্ষণাবর্তী। অতঃপর সম্রাট হর্ষ বর্ধন শশাঙ্ককে পরাজিত করে এই অঞ্চলকে তারা করায়ত্ত করেন। অতএব বলা যায় যে বৃহত্তর যশোরসহ নড়াইল জেলা শশাঙ্গ ও হর্যবর্ধন রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। আনুমানিক দেড়শত বৎসর নড়াইল জেলা অঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূ-স্বামী বাহুবলে শাশিত হয়েছিল বলে জানা যায়। শুধু এই অঞ্চলই নয় সমগ্র বাংলাদেশই এরূপ দু’জন রাজা ছিলেন নয়াবাড়ীর পাতালভেদী রাজা এবং উজিরপুর কশিয়াড়ার রাজা।

পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলে পাল বংশ দ্বারা শসিত হয়। পাল বংশের পতনের কর্ণাটক হতে আগত সেন রাজাদের রাজত্য কায়েম হয়। ১২০০ খ্রীষ্টাব্দে তুর্কি সেনা নায়ক ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বাংলাদেশ অধিকারের ফলে রাজা লক্ষণ সোনের রাজত্বকাল সমাপ্তি ঘটতে থাকে। এরপর আসে মুসলিম শাসনামল। তখন, বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় পর্যায়ক্রমে ৩৭ বৎসর পাঠান আমল এবং অতঃপর প্রায় দুইশত বৎসর স্বাধীন সুলতানী আমল বিরাজমান ছিল। ইংরেজ আমলে ১৭৮৬ সালে যাশোর একটি জেলা রূপে স্বীকৃতি পায়। তখন নড়াইলের পূর্বাঞ্চল ব্যতীত সমগ্র বৃহত্তর যশোরসহ বৃহত্তর খুলনা জেলা যশোরের অন্তর্গত ছিল। ১৯৯৩ সালে নলদী পরগণা সহ ভূষণা ফরিদপুর জেলার পশ্চিমাঞ্চল যশোরের অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৮৪২ সালে খুলনাকে পৃথক মহকুমায় পরিণত করে নড়াইলের কালিয়া থানার দক্ষিণাঞ্চল তার অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ১৮৬১ সালে নীল বিদ্রোহের সময় নড়াইল একটি পৃথক মহকুমা স্থাপিত হয়। মহকুমা সদরের স্থান নির্বাচনের জন্য মহিষখোলা মৌজার নড়াইল মহকুমার সদরকেই বেছে নেয়া হয়। প্রকৃত নড়াইল মৌজা শহর হতে ৩ কিলোমিটার দূরে যেখানে নড়াইলের জমিদারদের প্রসাদ অবস্থিত ছিলো এবং অপরদিকে মহকুমা প্রশাসকের বাসভবনই নীলকরদের কুঠিবাড়ী ছিল।

১৯০১ সালের শুমারী অনুযায়ী নড়াইল মহকুমা-নড়াইল, বড় কালিয়া, লোহাগড়া থানা সমন্বয়ে গঠিত যার লোক সংখ্যা ছিলো ৩৫২২৮৯ জন। ১৯৩৯ সালের তথ্যে জানা যায় যে, সাবেক যশোরের পাঁচটি মহকুমার পূবাঞ্চলের একটি সমৃদ্ধশালী মহকুমা ছিল নড়াইল। ১৯৩৫ সালে সীমানা পূর্ণগঠনের প্রেক্ষিতে বিদালী, পোড়ালী ও শেখহাটি ইউনিয়নকে নড়াইল থানার সাথে এবং পোড়লী ইউনিয়নকে কালিয়া থানার সাথে সংযুক্ত করা হয়।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর লোহাগড়া, কালিয়া, আলফাড়াঙ্গা ও নড়াইল এই চারটি থানা সমন্বয়ে নাড়াইল মহকুমা অবশিষ্ট থাকে। ১৯৬০ সালে আবার আলফাডাঙ্গা নাড়াইল হতে বিছিন্ন করে ফরিদপুরের সঙ্গে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এইভাবে বিভিন্ন সময় নড়াইলের ভৌগোলিক সীমারেখা সংকুচিত করা হয়েছে।

বর্তমানে ৪টি থানা সমন্বয়ে নড়াইল জেলা গঠিত-
লোহাগড়া, কালিয়া, নড়াগাতি ও নড়াইল সদর।

১৯৪৮ সালে ১ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে নড়াইলকে জেলা হিসেবে ঘোষণা দেয়া হলেও অনেক সংগ্রাম, হরতাল, সমাবেশ ও অনশন ধর্মঘটের ফলশ্রুতিতে ১৯৮৪ সালের ১লা জুলাই নাড়াইলকে পূণাঙ্গ জেলা হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নড়াইল জেলার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। যেমন জেলার শিক্ষিতের হার ২৯% যেখানে দেশের শিক্ষিতের হার ২৪%। জেলার ১টি সরকারী ও ১টি মাহিলা কলেজসহ মোট ৬টি কলেজ বিদ্যমান। ৭৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২টি সরকারী, ৯টি বালিকা ও জুনিয়র বালিকা বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭টি। এছাড়াও ১টি মহিলা মাদ্রাসা ও ১টি কামিল মাদ্রাসা রয়েছে। ঐতিহাসিক পুরাকীর্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল প্রায় দেড় ডজন স্থাপনা। তন্মধ্যে, রায়ত্তামের জোড়া বাংলা, নলদী গাজীর দরগাহ, পাতালবেদী রাজার বাড়ী লোহাগড়া প্রাচীন জোড় বাংলা, রাজা কেশব রয়ের বাড়ী, লক্ষ্মীপাশা কালীবাড়ী অন্যতম।

এইসঙ্গে ছিলো নড়াইলের কিংবদন্তীসম ফকির দরবেশ ও ধর্মপ্রচারকদের নাম উল্লেখযোগ্য যোমন- ফকির ওসমান, সাধক লেংটা শাহ, বুড়ো দেওয়ান, গঙ্গাধর পাগল অন্যতম। নড়াইলের বিভিন্নস্থনে চারজন জমিদার ছিল, যেমন নড়াইলের জমিদার হাটবাড়ীয়ার জমিদার কালাড়া ও নলদীর জমিদার, এছাড়াও এদের অধীন ৭ জন তালুকদার বা ছোট জমিদার দিন। নীলচাষ আমলে সমস্ত নড়াইলে প্রায় ২০টির মত নীল সাহেবদের কুঠিবাড়ী ছিল। সমস্ত জেলার প্রায় দেড়শত গ্রাম ও জনপদ নিয়ে গঠিত।

নড়াইল জেলায় রয়েছে প্রায় দুইশত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, তন্বন্ধ্যে বিশেষ খ্যাতি সম্পন্ন ৭জনের  নাম অন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, যেমন – সৈয়দ নওশের আলী- ফজলুল হক মন্ত্রী সভার মন্ত্রী, এস এম সুলতান- আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কিংবদন্তীসম শিল্পী, উদয় শঙ্কর- ভূবনখ্যাত শ্রেষ্ঠ নৃত্যশিল্পী, পন্ডিত রবিশঙ্কর- আন্তজর্তিক খ্যাতিসম্পন্ন সেতার শিল্পী, চারণ কবি মোসলেমউদ্দিন – ১৩০০ সালের রচয়িতা, কবিয়াল বিজয় সরকার – শ্রেষ্ঠ কবি গায়ক, ডাঃ নিহার রঞ্জন গুপ্ত- প্রায় ৫০টি উপন্যাসের লেখক, নূর জালাল – তেভাগা আন্দোলনোর মধ্যমনি, কমলদাশগুপ্ত – নজরুল সঙ্গীততের নির্ধারিত সুরকার ও অমলকৃষ্ণ সোম প্রাখ্যাত মঞ্চাভিনেতা ১০০ টির মতো মঞ্চ নাটক করেছেন, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মুহাম্মদ – ১৯৭১ এর সম্মুখসমরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।

তথ্য সূত্র : 
চিত্রা (পত্রিকা)
নড়াইল জেলা সমিতি, ঢাকা
অভিষেক ও পূণর্মিলনী – ২০০৫

সম্পাদনা :
মোঃ হাসানূজ্জামান (বিপুল)
শমিউল আমিন শান্ত সূত্র: Jessore Info

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close